Saturday, September 20, 2014

হোককলরব

আমার একটা বড় সমস্যা হচ্ছে যে আমি মানুষটি বড়ই ভীতুমনে মনে যাই ভাবি না কেন, মুখ ফুটে বলতে আমার বড়ই কষ্টভালোলাগা, মন্দলাগা কোনও কিছুই ঠিক মতো প্রকাশ করে উঠতে পারিনা। কিন্তু মুখে প্রকাশ না করলেও, নিজে বেশ ভালই জানি যে আসলে ঝামেলা নামক ব্যাপারটা আমার বড়ই অপ্রিয়।কারো সঙ্গে গলা তুলে কথা বলতে গেলে আমার বুক ধরফর করে।আমার কোনও কথায় কারো মুখ কালো হলে, লজ্জায় আমার মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে।আর এরকম করতে করতে,একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলুম যে আমি কী ভাবি, কী ভালবাসি না বাসি তার থেকে অন্যেরা কী ভাবে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গ্যাছে।এর জন্য আর কেউ দায়ী নয়, দায়ী একমাত্র আমি নিজে। ছোটবেলায় যেদিন খেলতে গিয়ে, কিছু বিচ্ছু ছেলেমেয়ের হাতে কয়েক ঘা খেয়ে বাড়ি ফিরলাম, তার পরদিন থেকেই আমি খেলতে যাওয়ার সময় হলেই লুকিয়ে পড়তাম। উল্টে ওদের একটা গাট্টা দেওয়ার কথা আমি কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। আমার এক দূরদর্শী জ্যেঠু আমার কান্ডকারখানা দেখে খুব অল্প বয়সেই আমার নাম রেখেছিলেন ঢ্যারশ।আমি আজও প্রতি পদে পদে সেই নামকরণের সার্থকতার প্রমাণ দিয়ে চলেছি।
যাই হোক, যা বলছিলাম, ভীতু মানুষদের একটা খুব বিচ্ছিরি স্বভাব হচ্ছে যে, সে নিজে যেটা করতে পারে না, সেটা অন্য যদি কেউ করতে পারে, তাহলে মনে মনে সেই সাহসী মানুষটার কেনা হয়ে থাকে। কিন্তু মুখে বাহবা জানাতেও ভয়/লজ্জা পায়
দিন কয়েক আগে, যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় #হোককলরব শুরু হল, তখন(আসল ঘটনাটা জানার আগেই)মনে মনে ভেবেছিলাম, এই হয়েছে সব আজকালকার ছেলেমেয়ের দল!!কথা নেই বার্তা নেই, অবরোধ, ক্লাস বয়কট, মিটিং মিছিল..ধুততেরি ... রাজনীতি রাজনীতি করেই বাঙালির আর কিছু হল না...মনে মনে এদের গুষ্টি উদ্ধার করে (মুখে বলার সাহস আমার কোনও কালেই ছিল না)আবার নিজের গতানুগতিক জীবনের চরকায় তেল দিতে লাগলাম।ভেবেছিলাম, কয়েক দিন পরেই তো দুর্গাপুজো, সব আবার যেকে সেই....তখন তো আবার KFCতে বসে মুরগির ঠ্যাং চিবতে চিবতে শাহরুখ খান এর সিনেমা নিয়ে আলোচনা করবি.....পুজোয় হাল ফ্যাশন এর জামাকাপড় পরে, বিশেষ বন্ধুবান্ধবীদের হাত ধরে ঠাকুর দেখবি, ....মাঝখান থেকে খালি রাজনৈতিক দলগুলির মিডিয়ার footage খাওয়ার আর পরস্পরকে গালাগাল দেওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না।  
কিন্তু হাওয়াটা যত জলদি থামবে মনে করেছিলাম, তা ঠিক হল না।বরং উল্টে দিনে দিনে আমার virtual জগতের বন্ধুদের দেওয়াল ধিক্কার, রাগ আর অন্ধকারে ছেয়ে গেল।যদিও আমার virtual বন্ধুদের সকলকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব ভাল চিনি না, কিন্তু যাদের সঙ্গে সত্যিকারের পরিচয় আছে, যাদের বিচার বুদ্ধির উপর বেশ কিছুটা আস্থা আছে এবং যারা আমারই মতো রাজনীতি থেকে শতযোজন দূরে থাকতে পছন্দ করেন,তারাও যখন একে একে এই কলরবে গলা মেলালেন, তখন কেমন জানি হিসাবটা একটু গুলিয়ে গেল।  
আমার মতো ভীতু মানুষরা আবার সাংঘাতিক হিসেবী হয়, জানেন তো!! সব কিছু বাঁধা ছকে না পড়লে, কেমন যেন একটু অস্বস্তি হয়। অগত্যা হিসাব মেলাতে, অনিচ্ছাসত্তেও কলরবে কান পাততেই হলো। আর তরপরেই আমার আর কিছু মনে নেই।


এ কী করেছে এরা? সমাজের ক্ষমতাবান মানুষেরা, ক্ষমতাহীন মানুষগুলোকে শোষণ করবে,আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেবে, মেয়েদের সম্মান নষ্ট হলে তার দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে, ধর্ষক নয়, ধর্ষিতকেই দিনের পর দিন অপমান সহ্য করতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলি আমাদের ক্ষতের আগুনে নিজেদের সুবিধেমত হাত সেকবে ..এগুলোর সঙ্গে তো আমরা অনেকদিন আপোষই করে নিয়েছি।হঠাত্‍ কী হল বলুনতো সবার? বাচ্চা থেকে বুড়ো, রাজনৈতিক রঙ নির্বিশেষে একজোট হয়ে প্রতিবাদ করছে...বলি হচ্ছেটা কী?...কী যে হচ্ছে ঠিক জানিনা...কিন্তু আমার মতো সব সময় ভয় পাওয়া একটা মানুষের ভিতরে ভিতরে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে (প্রকাশ করতে ঠিক সাহস পাচ্ছিনা)। যেসব পাকা পাকা ছেলেমেয়েগুলোকে একেবারে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম যারা একদম গোল্লায় গ্যাছে, তারাই কিনা আজকে এতগুলো মানুষকে একসূত্রে বেধেছে, তাদের এত ক্ষমতা!!! ওদের আজকে সমাজের উপরতলার খবরদাররা ভয় পাচ্ছে!!! বাঙালি যে খালি চায়ের কাপে তুফান তুলেই ক্ষান্ত হয় না, এটা সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে...হাজার হাজার মাইল দূর থেকে তাই যেন ওরা একটা আজন্ম ভীতু মানুষকেও একটু সাহস যোগাচ্ছে। জানিনা ওদের এই আন্দোলনের ভবিষ্যত্‍ কী?জানিনা সময়ের স্রোতে একসময় এই উত্তাপ হারিয়ে যাবে কিনা....কিন্তু এই মূহুর্তে ওরা হাজার সূর্যের আলো হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি সেই আলোর একটুখানি নিজের জন্য ধার করে নিলাম। 

1 comment:

  1. Daarun :)
    It's so genuinely written...porlei bojha jachhe je , it's a slice of you!

    ReplyDelete